শেষ বলে ছক্কা; হতাশা নাকি ক্রিকেটের সৌন্দর্য

শেষ বলে ছক্কা:

তিন জাতি নিদাহাস ট্রফির ১৮ তারিখের ফাইনাল ম্যাচের শেষ বলে ছক্কা সারা বিশ্বের বাংলাদেশি সমর্থকের জন্যে এখনো এক হতাশা আর দুঃস্বপ্নের অভিজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই না। হয়তো আমাদের এই প্রজন্মের দর্শকদের জন্যে বাকি জীবনের এক আফসোসের নাম হয়ে থাকবে এই নিদাহাস ট্রফি। কিন্তু উল্টদিকে ভারতীয় বা একদিনের জন্যে ভারতীয় সমর্থক  বনে যাওয়া শ্রীলংকানদের জন্যে সে দিনের ম্যাচ এখনো এক আনন্দের উপলক্ষ । আসলে এখানেই ক্রিকেট নামক খেলাটার মহিমা। শেষ বলের আগে এখানে কিছুই শেষ হয় না।

দিনেস কার্তিকের শেষ বলে ছক্কা
দিনেস কার্তিকের শেষ বলে ছক্কাI Source: CricketCountry.com

আজকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তেমনি পাঁচটি ঘটনার কথা বলবো যেখানে শেষ বলের ছয়ে এক দল মেতে উঠেছিল জয়ের বুনো উল্লাসে আর অন্য দল হতাশা আর চোখের জলে মাঠ ছেড়েছে।

জাভেদ মিয়াঁদাদ বনাম চেতন শর্মা (পাকিস্তান-ভারত,সারজা,১৯৮৬)

স্বল্প দৈর্ঘের ক্রিকেটে শেষ বলের ছক্কায় ফলাফল নির্ধারনের ঘটনা বিশ্ববাসী প্রথম প্রত্যক্ষ করে ১৯৮৬ সালে। সারজায় অনুষ্ঠিত আস্ট্রেলেশিয়া কাপের ফাইনালে, ভারত পাকিস্তানের সেই মহারণে। পাকিস্তান ভারতের দেয়া ২৪৬ রান তাড়া করতে নামে, যা ছিল কিনা তৎকালীন সময়ের রেকর্ড। চেতন শর্মার করা শেষ ওভারের শেষ বলে যখন পাকিস্তানের গ্রেট জাবেদ মিয়াঁদাদ কোন মতে রান আউট থেকে বেঁচে স্ত্রাইকিং প্রান্তে যান তখন সমীকরণ ১ বলে ৪ রান । চেতনের ইয়োর্কার করতে গিয়া করা ফুলটচ কে মিয়াঁদাদ লং অনের মাথার উপর দিয়ে উড়িয়ে ছক্কা মেরে ১১৬ রানের এক মহাকাব্যিক খেলে দলকে ৩ উইকেটে জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন।

ল্যান্স ক্লুজনার বনাম ডিওন ন্যাশ (দক্ষিন আফ্রিকা-নিউজিল্যান্ড, নেপিয়ার, ১৯৯৯)

১৯৯৯ সালে দক্ষিন আফ্রিকার নিউজিল্যান্ড সফর। পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ২-১ এ এগিয়ে স্বাগতিকরা। চতুর্থ ম্যাচে  ক্লুজনার যখন ক্রিজে যান তখন দক্ষিন আফ্রিকার প্রয়োজন ছিল ২৪ বলে ৩৭ রান। ডিওন ন্যাশের করা শেষ ওভারের শেষ বলে ক্লুজনার ছক্কা হাঁকিয়ে সিরিজে ২-২ এর সতা ফেরান। এক্ষেত্রেও অবশ্য তাঁদের জয়ের জন্যে শেষ বলে ৪ রানেরই দরকার ছিল।

Lance Kluseners last over hit
Source: cricbuzz.com

ব্রেন্ডন টেইলর বনাম মাশরাফি মুর্তজা (জিম্বাবুয়ে-বাংলাদেশ, হারারে, ২০০৬)

দুঃখিত আপনাদের আরো একটি দুঃস্মৃতি মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যে। ১২ বছর আগের বাংলাদেশের জিম্বাবুয়ে সফরের ঘটনা। ২৩৭ তাড়া করতে নামা জিম্বাবুয়ে এক সময়ে ১৫৪-৭ এ পরিণত হয়। কিন্তু মাশরাফি মুর্তজার করা শেষ ওভারের শেষ বলে যখন জিম্বাবুয়ের প্রয়োজন ৫ রান তখন স্ট্রাইকে থাকা ব্রেন্ডন টেইলর লং অনের উপর দিয়ে বিশাল এক ছয় মেরে দলকে ২ উইকেটের জয় ও সিরিজে ২-১ এর লিড এনে দেন। আর ইতিবাচক দিকটি হল সেই একই ম্যাচে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম ওয়ানডে হ্যাট্রিকটি করেন শাহাদাত হোসেন।

Brendon-Taylor
Source: CricTracker.com

শিবনারায়ণ চন্দ্রপল বনাম  চামিন্দা ভাস (ও.ইন্ডিজ-শ্রীলংকা, পোর্ট অফ স্পেন, ২০০৮)

শিবনারায়ন চন্দ্রপল যে একজন অসাধারণ ক্ল্যাসিকাল ব্যাটসম্যান তা নিয়ে কারো কোন সন্দেহ ছিল না। কিন্তু ২০০৮ সালের শ্রীলংকার ও.ইন্ডিজ সফরের ১ম ওয়ানডেতে তিনি যা করেছিলেন তা হয়তো কেউ কল্পনাও করতে পারে নি। ২৩৬ রানের টার্গেটের ম্যাচের চামিন্দা ভাসের করা শেষ ওভারে ১১ রান প্রয়োজন ছিল ও.ইন্ডিজের। প্রথম ৪ বলে মাত্র ১ রান হওয়ায় শেষ ২ বলে দরকার হয় ১০ রান । আর তখনি ৫ম বলে চার আর শেষ বলে মাহেলা জয়বর্ধনের মাথার উপর দিয়ে ছক্কা হাঁকিয়ে ১ উইকেটের জয়ে  ম্যাচ নিজেদের করে নেন চন্দ্রপল। অথচ এর আগে চামিন্দা ভাস তাঁর ৯ ওভারে দিয়েছিলেন মাত্র ১৯ রান!

Shivnarine-Chanderpaul
Source: CricketCountry.com

দিনেস কার্তিক বনাম সৌম্য সরকার (ভারত-বাংলাদেশ, প্রেমাদাসা, ২০১৮)

অতিসম্প্রতি ঘটে যাওয়া এই টি২০ ম্যাচে ভারতকে ১৬৭ রানের টের্গেট দেয় বাংলাদেশ। ভারতের রান তাড়া করার ১৮তম ওভার শেষে সমীকরণ ছিল ১২ বলে ৩৪, অর্থাৎ বাংলাদেশের পক্ষেই। কিন্তু দিনেস কার্তিকের অতি মানবীয় ৯ বলে ২৯ রানে সব সমীকরণ ওলোটপালট হয়ে যায়। একাদশের অনিয়মিত বোলার হয়েও শেষ ওভারের প্রথম ৫ বলে মাত্র ৭ রান দেয়া সৌম্য সরকারের শেষ বলে ছয় মেরে ১ বলে ৫ রানের হিসাবটা মিটিয়ে ফেলেন ঐ কার্তিক, সাথে তিন জাতি কাপের ট্রফিটাও।

Source: cricbuzz.com

যদিও স্রীলংকার সাথে মাহমুদুল্লাহর শেষ বলের আগের বলে মারা ছয়েই বাংলাদেশ এই টুর্নামেন্টের ফাইনেলে ওঠে, কিন্তু ম্যাচের আরো এক বল বাকি থাকায় তা এই তালিকায় নেয়া হল না। কিন্তু তাঁর ইনিংসটিও ক্রিকেটের জন্যে একটি মহান অবদান। আর দিন শেষে ক্রিকেট তো একটা খেলাই। তাই আসুন মন খারাপ না করে এর রোমাঞ্চকর সৌন্দর্যটুকুই উপভোগ করি।

, , , , , , ,