বিশ্বকাপ ২০১৮: বিশ্বকাপের বিস্ময় ক্রোয়েশিয়ার গৌরব যাত্রার কাহিনী

বিশ্বকাপ শুরুর আগে একটি দলের ফিফা র‍্যাংকিং ছিল ২০। আর বিশ্বকাপের আসরে সেই দলের সর্বোচ্চ সাফল্য বলতে ২০ বছর আগে একবারমাত্র সেমিফাইনাল খেলা। ফেভারিটদের বেশ বড়সড় একটা তালিকা করলেও সেখানে তাঁদের স্থান হত কিনা সন্দেহ। অথচ সেই দলটিই কিনা এবারের বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলছে। বিস্ময় ঘেরা এই বিশ্বকাপে এর থেকে বড় বিস্ময় আর কিইবা হতে পারে!

কাদের কথা বলছি সেটা না বললেও চলে, তারপরও বলতে হয়। বলছিলাম এবারের আসরের সবচেয়ে বড় চমক জাগানিয়া দল মাত্র ৪২ লাখ জনগনের দেশ, বালকান রাষ্ট্র ক্রোয়েশিয়ার কথা।

এবারের বিশ্বকাপে তাঁদের স্বপ্ন যাত্রাটি কয়েকটি ধাপে আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করবো আমরা। চলুন দেখে নেয়া যাক।

গ্রুপ পর্বের ঘটনাদি:

গ্রুপ ডি তে থাকা ক্রোয়েশিয়ার বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয় নাইজেরিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে তাঁদের জয়টা অনুমিতই ছিল, কিন্তু পরের ম্যাচে তাঁরা মেসির আর্জেন্টিনাকে ৩-০ গোলে যেভাবে উড়িয়ে দেয় তাতে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের আগমনী বার্তাই দিয়ে রাখে ক্রোয়েটরা। গ্রুপের শেষ ম্যাচে আইসল্যান্ডকে ২-০ গোলে হারিয়ে টানা ৩ ম্যাচ জিতে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই নকআউট পর্ব নিশ্চিত করে ক্রোয়েটরা। আর নকআউট পর্বে যাওয়ার আগে স্ট্রাইকার নিকোলা কালিনিচকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে ২২ সদস্যের দলে পরিণত হয় ক্রোয়েশিয়া।

Source: Fanatik

রাউন্ড অফ ১৬:

ক্রোয়েশিয়ার রাউন্ড অফ ১৬ এ প্রতিপক্ষ হিসেবে পায় ফর্মে থাকা ডেনমার্ককে। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ১-১ গোলের সমতায় থাকা ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে।  সেখানেও কোন ফলাফল না আসাতে রেফারিকে টাইব্রেকারের শরণাপন্ন হতে হয়। আর তাতে প্রতিপক্ষের ৩টি শট ঠেকিয়ে দিয়ে ক্রোয়েশিয়ার জয়ের নায়ক বনে যান গোলকিপার দানিয়েল সুবাসিচ।

Source: Sports Africa

মহা নাটকীয় কোয়াটার ফাইনাল:

কোয়াটার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার প্রতিপক্ষ ছিল স্বাগতিক রাশিয়া। রাশিয়ার কোয়াটার ফাইনালে ওঠা যতটা না আশ্চর্যজনক ছিল তার চেয়ে তাঁদের মাঠের পারফর্মেন্স বেশি বিস্ময়কর ছিল। সে যাই হোক, ঐ ম্যাচের প্রথম গোলের লিডটা নেয় স্বাগতিকরাই। পরে সেই গোল শোধ করে খেলায় সমতা আনে ক্রোয়েশিয়া। ৯০ মিনিট পর্যন্ত খেলার ফল ঐ একই থাকায় খেলা গড়ায় বাড়তি ৩০ মিনিটে। এবার সেই ৩০ মিনিটের শেষ ১০ মিনিটে যথাক্রমে গোলের দেখা পায় ক্রোয়েশিয়া ও রাশিয়া। আবারো ফলাফল নির্ধারনের জন্যে টাইব্রেকারের আগমন তাতে আবারো জয়ী দলের নাম ক্রোয়েশিয়া। দীর্ঘ ২০ বছর পর আবারো সেমি ফাইনাল নিশ্চিত করে ছোট্ট এই বালকান রাষ্ট্রটি।

Source: Sporting News

ঐতিহাসিক সেমিফাইনাল: 

সেমিফাইনাল খেলতে নামার আগে পর দুটি ১২০ মিনিটের ম্যাচ খেলে বেশ ক্লান্তই ছিল ক্রোয়েটরা। আর এই ক্লান্তিকে পুঁজি করে ম্যাচে নিজেদের এগিয়ে রাখছিল ব্রিটিশ মিডিয়া আর ইংল্যান্ড দল। এর সাথে আবার সেমিতে তাঁদের আগাম জয় নিশ্চিত করে “ইটস কামিং হোম” স্লোগানের রব তুলে ফেলেছিল ব্রিটিশ মিডিয়া। এমনকি ম্যাচের শুরুতেই কিরেন  ট্রিপারের অসাধারণ ফ্রি কিকে লিড নিয়ে নেয় ইংলিশরা। কিন্তু প্রতিপক্ষ দলের নাম যখন ক্রোয়েশিয়া আর সেই দলে আছেন মদরিচ-রাকিতিচ-মানজুকিচের মত হার না মানা বিশ্বমানের সেনানী, তখন চমকপ্রদ কিছুর আশা করাই যায়।

Source: The Australian

আর হলও ঠিক তেমনটাই। দ্বিতীয়ার্ধে মদরিচ-রাকিতিচদের একের পর এক আক্রমনে কোণঠাসা হয়ে ৬৮ মিনিটে ম্যাচের লিড হারায় ইংলিশরা। আর আগের দুই ম্যাচে ২৪০ মিনিট খেলা নিয়ে ব্যাঙ্গ করায় যেন এদিনও আবার ১২০ মিনিট খেলার পণ করে ক্রোয়েশিয়া। নির্ধারিত সময়ে ১-১ স্কোরে থাকায় খেলা গড়ায় সেই বাড়তি ৩০ মিনিটে। সেই ৩০ মিনিটের ১৯ তম মিনিটে ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণকারী গোল করে দলকে প্রথম বারের মত বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলেন ক্রোয়েশিয়ান স্ট্রাইকার মারিও মানজুকিচ।

ক্রোয়েশিয়া ফাইনালে ওঠাতে সারা বিশ্বের পাশাপাশি অবাক হয়েছেন ক্রোয়েশিয়ারর ফুটবলের একসময়ের সবচেয়ে বড় তারকা দাভর সুকার নিজেও। আর তাইতো দলের  ফাইনাল নিশ্চিত হওয়ার পর টুইট করে তিনি লেখেন, “একদম অবাস্তব লাগছে। কিন্তু এটাই সত্যি, ক্রোয়েশিয়া ফাইনালে। তোমরা ছোট দেশটিকে গর্বিত করেছ।”

Source: DNA India

ক্রোয়েশিয়ার ফাইনালে যাওয়াটা আসলেই অবাক করা সত্যি। অবশ্য ফাইনালে তাঁদের প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছে ফ্রান্স, যারা কিনা আক্ষরিক অর্থেই এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে শক্তিশালী দল। তাই ক্রোয়েটদের স্বপ্নযাত্রাটা কোথায় গিয়ে শেষ হয় তা বলা মুশকিল। তবে প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তা বিবেচনা করে  ক্রোয়েশিয়াকে নিয়ে আগাম কোন ভবিষৎবাণী করাও কঠিন, যা তাঁরা ইতোমধ্যেই খুব ভাল ভাবে প্রমাণ করে এসেছে। তাই ক্রোয়েটদের শেষ হাসি অথবা কান্নার ভবিষৎবাণী ১৫ তারিখ মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামের জন্যেই তোলা থাক আপাতত।

 

, , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , ,