বিশ্বকাপ ফুটবল – ২০১৮: ইউরোপের সূক্ষ্মতা, নাকি ল্যাটিনের মাদকতা (পর্ব-১)

হাজারো উপমা দিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবলকে আখ্যায়িত করা গেলেও এককথায় এই মহাযজ্ঞটি “গ্রেটেস্ট শো অন দ্যা আর্থ” উপাধিতেই সবচেয়ে উপযুক্ত। পৃথিবীর কোটি কোটি দর্শক ও সমর্থকের ভীড়েও ঈশ্বর কেন যে ঘুরে-ফিরে বারবার ইউরোপ আর ল্যাটিন আমেরিকার ফুটবলকেই শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরিয়েছেন, সেটা একমাত্র তিনিই বলতে পারবেন। এ যাবৎ অনুষ্ঠিত ২০ টি ফুটবল বিশ্বকাপই তাই ইউরোপ (১১টি) এবং ল্যাটিন আমেরিকা (৯ টি) ভাগাভাগি করে নিয়েছে।

বিশ্বকাপ ফুটবল

সাম্প্রতিক ফুটবল বিশ্বের হালচাল বিবেচনা করে অনেকটা নিশ্চিতভাবেই বলা যেতে পারে, ২০১৮’র বিশ্বকাপটাও এই দুই মহাদেশের মধ্যেই থাকছে। বাস্তবতা এবং বর্তমান পার্ফমেন্সের নিরিখে আজকের পর্বে থাকছে ইউরোপের দেশগুলোর বিশ্বকাপ জয়ের সামর্থ্য এবং সম্ভাবনা।

ইউরোপ থেকে মোট বিশ্বকাপ জয়ী দেশ ৫ টা- জার্মানি ও ইতালি (৪ বার করে), এবং ইংল্যান্ড, ফ্রান্স আর স্পেন (প্রত্যেকে ১ বার করে)। ইউরোপ, তথা পুরো ফুটবল বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি ইতালির দুর্ভাগ্যজনক অনুপস্থিতে (বাছাই পর্ব থেকে ছিটকে পরে ইতালি) এবারের বিশ্বকাপে ইউরোপের শিরোপাধারী প্রতিনিধি থাকছে চারটি। আর চমক দেখানোর জন্য ফুটবল-প্রেমীরা চোখ রাখতে পারেন সিআর সেভেনের পর্তুগাল আর বেলজিয়ামের উপর। এছাড়া স্বাগতিক হওয়ার সুবাদে রাশিয়া কিছুটা সুবিধা ভোগ করলেও দলটা কতদূর যাবে সেটা আপাতত সময়ের উপরেই ছেড়ে দেয়া যাক।

গ্রুপ বিবেচনায় ইংল্যান্ডের প্রায় শতভাগ সম্ভাবনা রয়েছে নক আউট পর্বে ওঠার। একই বিবেচনায় সুফল ভোগ করতে পরে বেলজিয়াম, কেননা গ্রুপ-জি তে ইংল্যান্ড আর বেলজিয়ামের প্রতিপক্ষ হিসাবে খেলবে তিউনিসিয়া আর পানামার মত তুলনামূলক দুর্বল দলগুলো। ১৯৬৬’র শিরোপা জয়ী ইংল্যান্ডের সাম্প্রতিক ফর্ম যাই হোক না কেন, তারা তাদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারলে অন্তত কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত যাওয়ার আশা করতেই পারে। ফিকচার অনুযায়ী কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের দেখা হতে পারে ব্রাজিল অথবা জার্মানির। সেখানেই হবে তাদের মূল পরীক্ষা। তবে তার আগে তাদের গ্রুপ-এইচ থেকে উঠে আসা পোল্যান্ড/কলম্বিয়া/সেনেগাল অথবা জাপানের বাঁধা টপকাতে হবে। এক্ষেত্রে কলম্বিয়া হতে পারে তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ। অন্যদিকে বেলজিয়ামের সমীকরণও অনেকটা ইংল্যান্ডের মতই।

বর্তমান চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে নিয়ে আসলে ভবিষ্যৎবাণী করার কিছু নেই। গাণিতিক সম্ভাব্যতার মান সবসময় ০ থেকে ১ এর মধ্যে থাকলেও বিশ্বকাপে জার্মানির সম্ভাবনা আর যাই হোক, কখনোই ০ হয় না, বরং ১ এর কাছাকাছি থাকে। ১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০ আর ২০১৪’ র নাম্বার ওয়ান টিমকে তাই ভাবতে হবে সেমিফাইনালের পর থেকে। কারণ সেখানে তাদের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে ব্রাজিলের মুখোমুখি হবার। যদি সেই সম্ভাবনাই সত্যি হয়, তাহলে গতি আর সৌন্দর্য্যের ধ্রুপদী এক ম্যাচের প্রত্যাশায় সমর্থকেরা এখনই ক্ষণ গণনা শুরু করতে পারেন।

এক অন্য মাত্রার খেলার জন্ম দিয়ে স্পেন অনেকটা বলে-কয়ে ২০১০’র বিশ্বকাপটা নিজেদের করে নেয়। এবার অনেকটা আন্ডার-রেটেড হলেও সম্প্রতি আর্জেন্টিকে হাফ-ডজন গোলের লজ্জায় ডুবিয়ে স্পেন যেন একটা হুঙ্কারই দিয়ে রেখেছে। তবে, গ্রুপের শিডিউল অনুসারে সেই আর্জেন্টিনার সাথেই কোয়ার্টার ফাইনালে দেখা হতে পারে স্পেনের। এমনকি কোন একটা দলের পা হড়কালে সেমি’র আগেই মুখোমুখি হওয়া লাগতে পারে ভয়ঙ্কর ফ্রান্সের। বিশ্বকাপের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার জন্য যে ওই একটা পা-হড়কানো ম্যাচই যথেষ্ট!!

ইউরোপের সর্বশেষ এবং সবচেয়ে বড় ট্রাম্পকার্ডটা ফ্রান্স। ‘৯৮-র শিরোপা জয়ী জিদানের ফ্রান্স এবার গ্রিজম্যান-এমবাপ্পে-পায়েত-পগবা-জিরুদ-ডেমবেলে-লরিস সহ একঝাঁক অসাধারণ ফুটবলারের সমন্বয়ে গড়া অনেকটা ‘৭০-র বিশ্বকাপের ব্রাজিলের মত ড্রিম-টিম। এই ফ্রান্সের ‘তারকা-সমৃদ্ধ’ খ্যাতি(!) ব্যতীত অন্য কোন খুঁত নেই। ফুটবল ঈশ্বর যদি বিরূপ না হন, তবে এই দলটার ফাইনাল না খেলা হবে বিশ্বকাপের অন্যতম আপসেট। তবে সেই ফাইনালের পথে ফ্রান্সকে টপকাতে হতে পারে পর্তুগাল, স্পেন অথবা আর্জেন্টিনার মত বড় বড় হার্ডলকে।

Source: FINASH-FOOTBALL

ইতালি, নেদারল্যান্ডের মত বড় বড় নামের অনুপস্থিতি ২০১৮-র বিশ্বকাপকে অনেকটা মলিন করে দিলেও এর আবেদন কমাতে পারেনি বিন্দুমাত্র। অনিশ্চয়তার সৌন্দর্যে মোড়া ফুটবলে এবার ইউরোপের শিরোপা প্রত্যাশী জার্মানি-স্পেন-ফ্রান্সের পাশাপাশি অতীত ঐতিহ্যের ধারক ইংল্যান্ড যেমন বরাবরের মত ভাল কিছুর স্বপ্ন দেখছে, তেমনি বেলজিয়াম আর পর্তুগাল (বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়ন) তাদের সাম্প্রতিক পারফর্মেন্সের ধারাবাহিকতায় নিজেদের ডার্ক হর্স হিসাবে ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে। এখন ল্যাটিন ফুটবলের মাদকতাকে ডিঙিয়ে নিখুঁত ফুটবলের ইউরোপ কতটা সফল হতে পারবে তার জন্যে সবাইকে চোখ রাখতেই হচ্ছে ১৫-ই জুলাই, মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামের ফাইনালে।

, , , , , , , , , , , , ,