বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিসিএল): পৃথিবীর সবচাইতে অবহেলিত ১ম শ্রেনীর ক্রিকেট লিগ

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগশেষ হল দেশের ঘরোয়া ১ম শ্রেনীর ক্রিকেটের সবচেয়ে মর্জাদাপূর্ণ আসর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের ৪র্থ রাউন্ড। আর সবচেয়ে মজার বিষয় হল, চার রাউন্ডের মধ্যে মাত্র ১ টি ম্যাচেই জয় পরাজয়ের হিসেব কসতে হয়েছে। ব্যক্তিগত অনেক অর্জনের ভীড়েই বেশিরভাগ সময়ই ঢাকা পরে যাচ্ছে ফলাফলহীন ম্যাচগুলোর ক্রিকেটীয় তাৎপর্য। যদিও কখনো সখনো আবহাওয়ার বৈরী ভাবের কারনে ম্যাচের ফলাফল ভেস্তে যায়, কিন্তু প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা পূর্ণ ম্যাচ খুব একটা চোখে পড়ে কই?

ঘরোয়া ক্রিকেট যদি খেলা শেখার মূল জায়গা হয় তবে এইরকম প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন এক ১ম শ্রেনীর ক্রিকেটের আসর থেকে নিয়মিত জয় পরাজয়ের অভ্যাস গড়ে উঠবে কি? আমাদের কাছে আসলেই এর উত্তর জানা নেই।

অনেকে হয়তো বলতে পারেন, “আরে ভাই আমরা তো এখন অস্ট্রেলিয়া ইংল্যান্ডকেও টেস্টে হারাচ্ছি! আপনার সমস্যাটা কি?” কিন্তু আমি বলবো ভাই ঐ ম্যাচগুলোর ম্যাচ সামারি একটু খেয়াল করে দেখে আসুন। ম্যাচগুলো যে কোন এক বা দুইজন খেলোয়াড়ের অতিমানবীয় পারফর্মেন্সই বাংলাদেশ জয় পেয়েছে এতে কোন সন্দেহ থাকার কথা না।
আর তা দিয়ে কোন মতেই একটি টেস্ট দলের প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা যায় না।

এবার কথা হল আমরা টেস্ট খেলার সুযোগই বা পাই কত? তাহলে কেন আমরা টেস্ট খেলার ঘটতিটা বিসিএল দিয়ে দুধের সাধ ঘোলে মেটাতে পারছি না? এতে করে ম্যাচ প্রাকটিস আর বড় দৈর্ঘের ক্রিকেটে অভ্যস্ততা দুই ই হত।

কিন্তু বাস্তবতা হল এদেশের বোর্ড আর শীর্ষ পর্যায়ের খেলোয়ারেরা এই বিসিএলকে দায় সারা লিগই বানিয়ে ফেলেছেন। এই লিগ চলাকালে জাতীয় দলের বেশির ভাগ খেলোয়ারই হয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ব্যস্ত থাকেন, আর তা না থাকলে বিশ্রামের সময় হিসেবে বেছে নেন। অনেকে তো আবার একান্ত নিরুপায় হয়েই মাঝে মধ্যে দু এক ম্যাচ খেলে থাকেন।

আর ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ ও বিপিএলের মত খেলোয়ারদের পেশাদারী মনোভাব টানতে বরাবরই ব্যর্থ  ১ম শ্রেনীর এই ঘরোয়া ক্রিকেট। তা না হলে একজন খেলোয়ার ম্যাঠে ফিল্ডিং করার সময় ফোনে কথা বলছেন! এমন দৃশ্য অন্য যে কোন দেশের ঘরোয়া ১ম শ্রেনীর ক্রিকেটে অকল্পনীয়।

Bangladesh cricket league 2018
Source: Bangladesh Cricket Board

আচ্ছা তাহলে এখানে মূল সমস্যাটা কোথায় ? খেলোয়াড় না বোর্ডের আন্তরিকতায়? আমি তো বলবো বোর্ডের আন্তরিকতাতেই মূল সমস্যা। কারন ২০০০ সালের আগে যখন এই লিগ ১ম শ্রেনীর মর্যাদা পায় নি, তখনি বরঞ্চ এই লিগের মর্যাদা খেলোয়ারদের কাছে বেশি ছিল। অন্য সকল দেশের মত এদেশেও তখন এই লিগে ভাল করেই জাতীয় দলের জন্যে বিবেচিত হতেন ক্রিকেটাররা।

আর এখন আপনি এই ১ম শ্রেনীর ক্রিকেটে যতই রানের ফোয়ারা কিংবা  উইকেটের ফুলঝুরি ছোটান না কেন তা জাতীয় দলে বিবেচনার জন্যে বিবেচ্য হয় না। আর সেটা যদি নাই হত তাহলে তো তুষার ইমরান, নাঈম ইসলাম, মার্শাল আইয়্যুব বা এনামুল জুনিয়রদের নিয়ে বিসিবির ভবনাটা অন্য রকম হত।

আর এই লিগে এক সময় বছরের পর বছর রানের ফোয়ারা ছোটানো গোলাম মাবুদ বা ফয়সাল হোসেন ডিকেন্সরা তো কখনো দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জ্বলে ওঠার সুযোগ না পেয়েই হারিয়ে গেলেন।

এখন হয়তো প্রসঙ্গ আসতে পারে যে এই লিগের সাথে আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটের তো যোজন যোজন পার্থক্য। আসলে এই পার্থক্যটা এখন পর্যন্ত কারা টিকিয়ে রেখেছে? এর দূর্বল অবকাঠমোর জন্যে বোর্ড কি দায়ি নয়?

পরিকল্পনাহীন নিম্ন মানের পিচ, প্রযুক্তির অপ্রতুলতা, লিগের সাংগঠনিক অব্যবস্থাপনা, এসকল বিষয়ের দায় তো আর খেলোয়াড়দের উপর বর্তায় না। আর বোর্ড তো সাবেক কোচ হাতুরুসিংহের ঘরোয়া লিগ না দেখার শর্ত এমনিতেও মেনে নিয়েছিল। এতেই তো প্রমাণিত হয় যে বিসিবি নিজে এই ঘরোয়া ১ম শ্রেনীর লিগের কতটা কদর করে।

আগে তো টেস্ট ক্রিকেটে একমাত্র জিম্বাবুয়ে ছাড়া কারো সাথেই বাংলাদেশের জয় পরাজয় নিয়ে মিডিয়া বা দেশের মানুষ মাথা ঘামাতো না। বিদেশের মাটিতে তো নাই, এমনকি দেশের মাটিতেও না। আর এখন তো আফগান আর আইরিশরাও টেস্টের এই অভিজাত ঘারাণায় চলে এসেছে। তাই বড়  দলগুলোর বিপক্ষে হঠাৎ পাওয়া দুই একটা জয় নায়, টেস্টে নিয়মিত পারফর্ম করার জন্যে হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা পূর্ণ একটি ১ম শ্রেণীর লিগ গড়ে তোলা টা এখন সময়ের দাবী।

, , , , , , ,