বাংলাদেশ ক্রিকেট: তরুণ তুর্কিদের অধারাবাহিকতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রস্তুতি

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলে তরুণ ক্রিকেটারদের পারফর্মেন্সের গ্রাফটা বিগত কিছুদিন ধরেই ধারাবাহিকভাবে অধারাবাহিক। ঘুরে-ফিরে সেই তামিম, মুশফিক, সাকিব, রিয়াদ আর ক্যাপ্টেন মাশরাফি (শুধু ওডিআইতে)-তেই আস্থা রাখতে হচ্ছে বিসিবি’র। ফলে ক্রিকেটের এই ব্যস্ত মৌসুমে একদিকে যেমন বিশ্রাম পাচ্ছেন না দলের সিনিয়র খেলোয়াররা, তেমনি ভবিষ্যতে দলের হাল ধরার জন্য তরুণ তুর্কিরা আসলে কতটুকু প্রস্তুত- তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ক্রিকেট অধিনায়ক
Source: The Cricket Monthly

শুরু করা যাক বোলিং ডিপার্টমেন্ট থেকেই। কারণ এটাকেই বলা যেতে পারে বাংলাদেশের ক্রিকেটে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। অনেকটা নিঃসংশয়েই বলা চলে, রুবেল-ফিজ জুটি একটা বড় সময় ধরে বাংলাদেশকে সার্ভিস দিতে চলেছে। মাশরাফি যতদিন আছেন, ততদিন এই পেস ট্রয়ো ওডিআইতে অন্তত আমাদের নির্ভার রাখবে। দুশ্চিন্তা টেস্ট এবং টি-টুয়েন্টি নিয়ে। মুস্তাফিজ তিন ফরমেটেই এখন পর্যন্ত ধারাবাহিকতা দেখাতে সমর্থ্য হলেও রুবেলের টেস্ট পারফর্মেন্স(২৫ ম্যাচে ৩৩ উইকেট) মোটেও সন্তোষজনক নয়। এমনকি টি-টুয়েন্টির অবস্থাও তথৈবচ(২২ ম্যাচে ২৩ উইকেট, ইকোনমি সাড়ে নয়ের উপরে)।

Source: The Daily Star

এর ওপর ক্যাপ্টেন মাশরাফিও হয়তো সামনের বিশ্বকাপের পর আর মাঠে নাও নামতে পারেন। এমনিতেই টেস্ট এবং টি-টুয়েন্টিতে মাশরাফির সার্ভিস স্থূলভাবেই অনুভূত হচ্ছে। সেক্ষেত্রে তৃতীয় একজন পেসার; সাথে পেসারদের রিজার্ভ বেঞ্চ শক্তিশালী করার চিন্তা করার এখনই উপযুক্ত সময়। ঘরোয়া লীগের পিচ পেস বোলিং সহায়ক করার সাথে সাথে পেসার হান্টিংয়ের মত কমর্সূচি হাতে নিলে এ ব্যাপারে সুফল আশা করা যেতে পারে। এছাড়া তাসকিন, রনি কিংবা রাহীর মত সম্ভাবনাময় পেসারদের হারিয়ে যাওয়ার আগেই তাদের সঠিক কাউন্সিলিঙের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। টেস্টের জন্য শহীদ, আল-অামিনকে বিবেচনায় রাখতে পারে বিসিবি।

স্পিনে সাকিব, তাইজুল, মিরাজ এখন পর্যন্ত ধারাবাহিক। ছোট পরিসরে ‘নাগিন’ অপুকে বলা হচ্ছে নতুন সেনশেসন, তবে তাকে আরও সময় দেয়া প্রয়োজন। আর মিরাজ দেশের মাটিতে দুর্দান্ত হলেও বিদেশে এখনো তার স্বাক্ষর রাখতে পারে নি। তবে মিরাজকে ধরে রাখতে পারলে বাংলাদেশ ক্রিকেট ভাল কিছু পাবে বলেই আশা করা যায়।

nazmul_islam nagin opu
‘নাগিন’ অপুকে বলা হচ্ছে নতুন সেনশেসন Source: World Sports 24

বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় আস্থার জায়গা মুশফিক-সাকিব-রিয়াদের ব্যাটিং এ শক্তিশালী মিডল অর্ডার। যতদিন এই তিন মায়েস্ত্রো আছেন, ততদিন নিশ্চিন্ত থাকা যায়। তবে অনূর্দ্ধ ঊনিশ থেকে আফিফ হাসান, পিনাক ঘোষ কিংবা শান্তকে এখন থেকেই প্রস্তুত থাকা দরকার। সম্ভব হলে দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে সিনিয়রদের বিশ্রাম দিয়ে এদের খেলানো যেতে পারে।

মোসাদ্দেক, মমিনুল আর লিটন দাস হতে পারে ভবিষ্যত বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রধাণ ব্যাটিং স্তম্ভ। এদেরকে অবশ্যই সঠিক ভাবে পরিচর্যা করা উচিত। ওয়ান ডাউনে যদিও এখন সাকিব অস্থায়ী ভাবে নামছে, তারপরও এই পজিশনটা বাংলাদেশের ক্রিকেটে সবচেয়ে দুশ্চিন্তার জায়গা। টেস্টে মমিনুল এই পজিশনের দুশ্চিন্তাটা দূর করতে পারলেও অন্য দুই ফরমেটে এই ঘাটতি রয়েই গেছে। ঘরোয়া লীগগুলো থেকেই এই পজিশনের জন্য যোগ্য ব্যাটসম্যান তৈরি করা প্রয়োজন।

সাব্বির আর সৌম্যের মত দুই অমিত প্রতিভাবান স্ট্রোক মেকারকে নিয়ে অবশ্যই গুরুত্ব সহকারে ভাবার সময় এসেছে। তবে নিজেদেরকে নিয়েই বেশি ভাবা উচিত। যে কোন সময় খেলার মোমেন্টাম চেঞ্জ করার জন্য আসলেই এই দুইজনের বিকল্প বাংলাদেশে খুবই কম আছে। প্রয়োজনে মানসিক ট্রেনারদের সহায়তা নিয়ে এদের কনফিডেন্স লেভেল শক্ত করতে হবে।

সবশেষে ওপেনিং জুটি। তামিম ইকবাল যেখানে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু তার জুটি হিসাবে কেউই বেশিদিন টিকতে পারছে না। এমনকি তামিমের অনুপস্থিতিতে কোন ওপেনারকে এখনো খুঁজে পায়নি বাংলাদেশ। অনেকে এনামুল হক বিজয়ের কথা বললেও বর্তমান বাংলাদেশ টিমের বিবেচনায় সৌম্য কিংবা লিটন হতে পারে তামিমের যোগ্য পার্টনার। কিন্তু এখানেও ধারাবাহিকতার প্রশ্নে আটকা পরে যেতে হয়।

Source: The Daily Star

তরুণ তুর্কিদের প্রতিনিয়ত আগলে রাখছে দলের সিনিয়র সদস্যদের ধারাবাহিক পারফর্মেন্স। যদিও একটা দলের চার-পাঁচজন নিয়মিত পারফর্মার থাকলে সেটাকে অনায়াসে ‘ড্রিম টিম’ বলা চলে, তারপরও সবদিন সবার পক্ষে পারফর্ম করা সম্ভব নয়। ইন্ডিয়া-অস্ট্রেলিয়ার রিজার্ভ বেঞ্চ শক্তিশালী হওয়ার কারণেই শচীন-গাঙ্গুলী-দ্রাবিড় কিংবা পন্টিং-ওয়ার্ন-গিলক্রিস্ট অবসরে যাওয়ার পরেও তারা এখন বিশ্ব ক্রিকেটে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট সে পর্যায়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেই পারে, তবে তার জন্য এখন থেকেই তরুণ ক্রিকেটারদের ধারাবাহিকতা চর্চার বিকল্প নেই।

, , , , , , , , , , , ,