টেস্ট ইতিহাসের টাই হওয়া ম্যাচের গল্প (পর্ব-১)

আক্ষরিক অর্থে, আপনি যখন টেস্ট ক্রিকেটের কথা শোনেন তখন আপনার মনে প্রথমে কোন কথাটি আসে? সম্ভবত, আপনার উত্তর হতে পারে, “ওহ! ক্রিকেটের সেই ফরমেট যেখানে ফলাফল ছাড়াই টানা ৫ দিন খেলা হয়।“ যদি আপনি এমনটাই মনে করে থাকেন, তবে আপনার মতামতকে কোন ভাবেই পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না কারন এযাবৎ খেলা মোট ২৩২২ টি টেস্টের মধ্যে ৬৬% ই ড্র হয়েছে।

Tale of Tied Teat matches in history of Test Cricket
Source: ESPNcricinfo

কিন্তু সেই বিশেষ পরিসংখ্যানটিই কিন্তু এটা প্রমাণের জন্যে যথেষ্ট নয় যে টেস্ট ক্রিকেট কোন রকম উত্তেজনার সৃষ্টি করতে পারে না। টেস্ট ক্রিকেট এত বছরে আমাদের বহু দর্শনীয় ম্যাচ উপহার দিয়েছে। এমনকি টেস্ট ক্রিকেটে এরই মধ্যে কয়েকটি টাই এবং শেষ বলে সমান সমান স্কোরের ড্র ম্যাচের অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছে। যদিও এই পরিসংখ্যানে কেবলমাত্র চারটি ম্যাচই রয়েছে, তবে এর প্রত্যেকটি বিস্তারিত বর্ণনার দাবি রাখে।

আসুন আমরা আপনাকে সেই সকল ম্যাচের গ্যালারীর একটি কাল্পনিক আসনে নিয়ে যাই যাতে আপনি আঙ্গুল কামড়ানো অনুভুতি নিয়ে ম্যাচের শেষ অংশটা উপভোগ করতে পারেন।

প্রথম টাই টেস্ট

অস্ট্রেলিয়া বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ব্রিসবেন, ১৯৬০

টস-ওয়েস্ট ইন্ডিজ

ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম ইনিংস ৪৫৩ অল আউট (১০০.৫ ওভার)

গ্যারি সোবার্স ১৩২ অ্যালান ডেভিডসন ৫/১৩৫

অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংস ৫০৫ অল আউট (১৩০.৩ ওভার)

নর্ম ও’নেল ১৮১ ওয়েস্ট হল ৪/১৪০

ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বিতীয় ইনিংস ২৮৪ অল আউট (৯২.৬ ওভার)

ফ্রাঙ্ক ওরেল ৬৫ অ্যালান ডেভিডসন ৬/৮৭

অস্ট্রেলিয়া ২ য় ইনিংস ২৩২ অল আউট (৬৮.৭ ওভার)

অ্যালান ডেভিডসন ৮০ ওয়েস্ট হল ৫/৬৩

প্রথমে আপনাকে বলে নেই তখনকার সময় অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট ক্রিকেট ছিল ৮ বলে ওভারের খেলা। তাই শেষ ওভারে আগে ২২৭/৭ এই অবস্থানে থাকা অস্ট্রেলিয়াকে শেষ ৮ বলে করতে হত ৬ রান। উইন্ডিজের হয়ে সেই মহা নাটকীয় শেষ ওভারটি করেন বোলার ওয়েস্ট হল। এখন সেই অসাধারণ শেষ ওভাররের দৃশ্যগুলো আপনাদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে।

১ম বল-ব্যাটসম্যান ওয়েলেই গ্রাউট লেগ বাই ১ রান নিয়ে অপর প্রান্তে থাক বেনাউডকে স্ট্রাইক ফেরত দেন।

২য় বল– বেনাউড একটি বুনো হুক শট খেলেন, কিন্তু বল ব্যাটের কানা ছুঁয়ে উইকেট কিপার গ্যারি আলেকজান্ডারের গ্লাভসে জমা পড়ে।

৩য় বল– নতুন ব্যাটসম্যান ইয়ান ম্যাকিফ বলটি মিড অফে ঠেলে পাঠান কিন্তু কোন রান হয় না।

৪র্থ বল– ম্যাকিফ ম্যাচের বিরলতম একটি ওয়াইড বলে বাই রান নেওয়ার জন্যে দৌড় দেন, কিন্তু বোলিং প্রান্তে পৌঁছানোর আগেই উইকেট কিপার আলেকজান্ডারের থ্রোতে রান আউট হয়ে যান। তখনো ৪ বল থেকে প্রয়োজন ৪ রান।

৫ম বল– বাউন্সারটি কোন মতে গ্রাউটের ব্যাটে আঘাত হেনে স্কয়ার লেগ অঞ্চলে ঊড়ে যায়। বোলার নিজের ফলোথ্রুতে ক্যাচের জন্যে ছুটে যান, ফিল্ডার রোহান কানহাইও ক্যাচ নেয়ার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। এই দু জনের ভয়ানক এক মিক্স আপে ক্যাচ মিচ হয়ে বল পড়ে যায় মাটিতে আর ব্যাটসম্যানরাও এর মধ্যে দ্রুত একটি রান নিয়ে ফেলেন।

৬ষ্ঠ বল– প্রকান্ডভাবে ব্যাট চালান ম্যাকিফ এবং বল মিড উইকেটে সীমানার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। যখন ফিল্ডার কানরাড হান্ট বলটি সীমানা আগ থেকে তুলে ফেরত পাঠান তখন ব্যাটসম্যানরা সাফল্যের সাথে নিজেদের মধ্যে দুই বার জায়গা পরিবর্তন করে তৃতীয়বারের জন্য দৌড়ে ছুটছেন। কিন্তু ফিল্ডারের থ্রো টি ছিল নিখুঁত এবং পরিষ্কার, ব্যাটসম্যান গ্রাউট ক্রিজে পৌঁছানোর আগেই কিপার আলেকজান্ডার বল ঘরে স্ট্যাম্প থেকে বেল আলাদা করে ফেলেন। এদিকে তখন স্কোর ছিল সমান এবং অস্ট্রেলিয়ানদের দরকার শেষ উইকেটে শেষ ২ বল থেকে ১ রান।

৭ম বল– নতুন ব্যাটসম্যান লিন্ডসে ক্লাইন বলটি কোন মতে স্কোয়ার লেগ অঞ্চলে ঠেলে দিয়েই জয় সূচক রানের জন্যে দৌড় লাগান। ফিল্ডার জ্যো সলোমন যখন বলটি তুলে থ্রো করবেন বলে ভাবছেন তখন তাঁর সামনে নিশানা করার জন্যে একটি মাত্র স্ট্যাম্পই ছিল। আর তাঁর সেই নিখুঁত থ্রো তে জয়সূচক রান পুর্ণ করার কয়েক ইঞ্চি আগেই ভেঙে যায় ম্যাকিফের স্টাম্প।

অস্ট্রেলিয়াকে ২৩২ রানে আউট করে দিয়ে টেস্ট ক্রিকেটের তখনকার ৮৪ বছরের ইতিহাসে প্রথম টাই ম্যাচের উপহার দেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

এখনকার মত আপনার মাউস অথবা স্ক্রিন স্ক্রোলিং টা বন্ধ রাখুন। যতক্ষন না আমরা টেস্ট ইতিহাসের অন্য অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ অন্য আরেকটি টাই ম্যাচ নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হচ্ছি ততক্ষনে কমেন্ট বক্স ব্যবহার করে আমাদের জানান এই ম্যাচটি কতটা বিস্ময়কর ছিল।

, , , , ,