চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল ২০১৮: রিয়াল মাদ্রিদের হ্যাট্রিক শিরোপার রেকর্ড আর সালাহর বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাওয়া ইঞ্জুরি

চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালের ফলাফল এতক্ষনে সবারই কম বেশি জানা হয়ে গেছে। লিভারপুলকে ৩-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে প্রথম কোন দল হিসেবে টানা তিনটি শিরোপা ঘরে তুলেছে রিয়াল।

চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল
Source: Sputnik International

যদিও ১৯৫৫-৫৬ মৌসুমে যাত্রা শুরু করা ইউরোপা কাপের প্রথম ৫ আসরের চ্যাম্পিয়নই ছিল এই স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ, তবে সেই ইউরোপা কাপ যখন খোলনলচে পাল্টে ১৯৯৩-৯৪ মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগে পরিণত হওয়ার পর থেকে কোন দলই টানা দুটির বেশি শিরোপা জিততে পারে নি।

রাশিয়া বিশ্বকাপ শুরুর আগে কিয়েভের অলিম্পিক স্টেডিয়ামে এই চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালই ছিল ফুটবলের সবচেয়ে বড় ইভেন্ট। আর এই বড় ইভেন্টের সকল আলো যে নিজেদের দিকেই টেনে নেবে স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল তা অনেকটা অনুমিতই ছিল। তবে অনুমানের বাইরে তো এই পৃথিবীতে কত কিছুই ঘটে।

আর সেই আশাতেই মাঠে হাজির হয়ে হওয়া অধিকাংশ দর্শকই যে লিভারপুলের ছিল তা লিভারপুলের সমর্থনে গাওয়া জোড়ালো কোরাস থেকেই প্রমান পাওয়া যায়। তবে রিয়ালের সমর্থনও যে খুব কম ছিল তাও বলা চলে না। কিন্তু  ১৩ বছর পর ইউরোপ সেরার মুকুট আর ফিরে পাওয়া হয়নি ইংলিশ ক্লাব লিভারপুলের।

চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল
Source: Sky News

আক্রমণ পালটা আক্রমনে শুরু হওয়া ফাইনালে যাবতীয় নাটকের শুরু হয় ম্যাচের ২৫ মিনিটে।  রিয়াল ডিফেন্ডার সার্জিও র‍্যামোসকে কাটিয়ে বল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন লিভারপুলের মিশরীয় রাজা মোহাম্মদ সালাহ। আর তাঁর সেই অগ্রযাত্রা আটকানোর চেষ্টা করেন র‍্যামোস । আর সেই ট্যাকেলের এক পর্যায়ে মো সালাহ আর র‍্যামোস  দুজনই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এতেই বাম ঘাড়ে প্রচন্ড আঘাত পেয়ে চোখের জলে মাঠ ছাড়েন লিভারপুলের আশা ভরসার কেন্দ্রবিন্দু মো সালাহ। তবে এই ঘটনায় র‍্যামোস যে ইচ্ছাকৃত ভাবে সালাহকে আঘাতপ্রাপ্ত করেছেন সেটা বলাটা যেমন যুক্তি সংগত নয় তেমনি তাঁর এই ট্যাকেলও যে যথেষ্ট বিতর্কিত ছিল সেটাও ঠিক।

এই ঘটনার ৭ মিনিট পরে ম্যাচের ৩৮ রিয়াল ডিফেন্ডার দানি কারভাহালও ইঞ্জুরির কারনে চোখের জলে মাঠ ছাড়েন। তবে এই ঘটনায়ভ অবশ্য কোন লিভারপুল খেলোয়াড় জড়িত ছিল না। এই দুই খেলোয়াড়কে হারিয়ে ০-০ তেই প্রথমার্ধের খেলা শেষ হয়।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই এক অভূতপূর্ব আর হাস্যকর গোলে দলকে লিড এনে দেন করিম বেনজামা। ম্যাচের ৫১ মিনিটে লুকা মডরিজের লং পাস বেশ সহজেই গ্রিপ করেন লিভারপুল গোলকিপার লরিস ক্যারিয়াস। গ্রিপ করা সেই বল তিনি সাথে সাথেই তার এক সতীর্থকে গড়িয়ে দিতে যান। কিন্তু তার একেবারে সামনেই থাকা বেনজাম বাম পা দিয়ে সেই বলের গতিবেগ পালটে জালে পাঠিয়ে দেন। সেই সাথে ম্যাচের অতি গুরুত্বপূর্ণ লিড পায় রিয়াল।

কিন্তু এই লিড বেশিক্ষন থাকে নি। ম্যাচের ৫৫ মিনিটে কর্নার থেকে গোল করে লিভারপুলকে ম্যাচে ফেরান সাদিও মানে। তবে খেলার দৃশ্যপট পালটে যায় বদলি খেলোয়াড় হিসেবে গ্যারেথ বেলের মাঠে নামার পরে। মাঠে নামার দুই মিনিটের মাথায় ম্যাচের ৬৩ মিনিটে এক অসাধারণ বাইসাইকেল কিক থেকে গোল করে দলকে ফের লিড এনে দেন বেল।

Champions League Final
Source: Sky News

বেলের এই গোল যেন কোয়াটার ফাইনালে জুভেন্টাসের সাথে রোনালদোর করা সেই অসাধারণ বাইসাইকেল কিকের কার্বনকপি। মার্সেলোর ক্রসে উলটো হয়ে শূন্যে ভেসে অদৃশ্য বাইসাইকেলে ডান পা দিয়ে কিক করে বল জালে জড়ান ওয়েলসের এই ফরোয়ার্ড।

এই বেলই ম্যাচের ৮৩ মিনিটে লিভারপুলের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেন। তবে এক্ষেতেও লিভারপুল গোলকিপার ক্যারিয়াসের অবদানই বেশি তা বলতেই হবে। বক্সের বেশ বাইরে থেকে নেয়া বেলের বা পায়ের জোড়াল শট ঠেকাতে গিয়ে আবারো পাড়ার ফুটবলের আনাড়ি গোলরক্ষকের মত ভুল করে বসেন লিভারপুলের এই গোলকি। তাঁর দুই হাতের ফাঁক গলে বল জড়ায় জালে, আর এতেই নিশ্চিত হয়ে যায় চ্যাম্পিয়নস লিগে রিয়ালের টানা তিন শিরোপার ইতিহাস।

আর রিয়ালের এই ইতিহাস গড়া কৃত্তির পেছনে কোচ জিদান যে অসামান্য ভুমিকা পালন করেছেন সেটা সকলের কাছেই  অনস্বীকার্য। কোচ হিসেবে রিয়াল মাদ্রিদ দলে ফিরেই টানা তিন তিনটি চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা! সত্যিই, কোচিং ক্যারিয়ারে জিদানের আর কিছু না জিতলেও চলবে।

mo salah crying
Source: Al-Arabiya

রিয়াল শিবির আর তাঁদের সমর্থকদের এই আনন্দের বিপরীতে লিভারপুলের পাশাপাশি দুঃখের অন্ধকার ঘিরে ধরেছে মিশরীয়দেরও। কেনই বা হবে না? রাশিয়া বিশ্বকাপে মিশরীয়দের আলোর মশালটাই যে বহন করবেন এই সালাহ। আর তাই বিশ্বকাপের আগে সালাহর সেরে ওঠার প্রার্থনায় অংশ নিতে আপনাকে মিশরীয় বা লিভারপুল ভক্ত হতে হবে না, একজন ফুটবল প্রেমী হলেই চলবে।

, , , , , , , , , , , , , , , , , , , ,