আইপিএলের ইতিহাসে লো-স্কোরিং ম্যাচগুলোর সাতকাহন

দিনে দিনে ক্রিকেট খেলাটা পুরোদস্তুর ব্যাটিং সহায়ক হয়ে উঠছে। মাঠে দর্শক আসে চার-ছয়ের মাতম দেখতে। আইপিএলের যুগে এখন বিশ ওভারেই দুই শতাধিক রানের ম্যাচ অহরহই দেখা যাচ্ছে। তারপরেও ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল টুর্নামেন্ট আইপিএল এমন কিছু লো-স্কোরিং ম্যাচের জন্ম দিয়েছে যেগুলোর কারণে এই খেলাটা এখনও পর্যন্ত ব্যাট ও বলের প্রতিদ্বন্দিতাকে সমতায় রাখতে সমর্থ্য হয়েছে। এবারের আয়োজনে থাকছে এখন পর্যন্ত আইপিএলের ইতিহাসে সবচেয়ে কম স্কোর ডিফেন্ড করা পাঁচটি ম্যাচের সাতকাহন।

. রয়েল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালোর বনাম চেন্নাই সুপার কিংস(২০০৮)

আইপিএলের ইতিহাসে লো-স্কোরিং ম্যাচগুলোর সাতকাহন
Source: BGR India

“মিস্টার ডিপেন্ডেবল” রাহুল দ্রাবিড়ের ৩৯ বলে ৪৭, আর শেষদিকে প্রাভিন কুমারের ১১ বলে ২১ রানের ক্যামিও ইনিংসে ভর করে চেন্নাইয়ের সামনে ১২৬ রানের দুর্বল এক লক্ষ্য দাঁড় করায় বেঙ্গালোর। অ্যালবি মর্কেল চেন্নাইয়ের পক্ষে ৩২ রানের বিনিময়ে তুলে নেন ৪ উইকেট। ব্যাট করতে নেমে প্রথম ৯ ওভারেই ৬০ রান যোগ করেন স্টিফেন ফ্লেমিং আর পার্থিব প্যাটেল।

এর পরেই শুরু হয় অনিল কুম্বলের ভেলকি। ৮৫/২ থেকে ১১২/১০ এ চেন্নাইয়ের ধ্বসে কুম্বলের ৪ ওভারে মাত্র ১৪ রানে ৩ উইকেট সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। ফলে এই প্রথম এত কম রান করেও সেটাকে ডিফেন্ড করা প্রত্যক্ষ করে আইপিএল। ম্যান অব দ্যা ম্যাচ হন অনিল কুম্বলে।

. মুম্বাই ইন্ডিয়ানস বনাম পুনে ওয়ারিয়র্স (২০১২)

আইপিএলের ইতিহাসে লো-স্কোরিং ম্যাচগুলোর সাতকাহন
Source: zeenews.india.com

প্রথমে ফিল্ডিং করতে নেমে ভুবেনেশ্বর কুমার (৩ ওভারে ৯ রানে ২ উইকেট) আর আশিষ নেহেরার (৪ ওভারে ১৯ রানে ২ উইকেট) বিধ্বংসী এবং কিপটে বোলিঙের বদৌলতে পুনে ওয়ারিয়র্স মাত্র ১২০ রানেই গুটিয়ে দেয় শচীন টেন্ডুলকারের মুম্বাই ইন্ডিয়ানসকে। শচীন ৩৪ বলে ৩৫ রানের ইনিংস খেলেন, যেটা ছিল সে ম্যাচে মুম্বাইয়েে সর্বোচ্চ স্কোর।

জবাবে ভালই খেলতে থাকে পুনে। মিডল অর্ডারে পঞ্চম উইকেট জুটিতে সৌরভ গাঙ্গুলির সাথে তরুণ মিঠুন মানহাসের ৪৭ রানের জুটি স্বপ্ন দেখাতে থাকে পুনেকে। কিন্তু ১৭ তম ওভারে গাঙ্গুলির উইকটে হোঁচট খায় পুনে। শেষ পর্যন্ত মানহাস ৪২ রানে(৩৪ বলে) অপরাজিত থাকলেও শেষ ওভারে মাত্র ১ রানে হেরে বসে পুনে ওয়ারিয়র্স। হরভজন সিং আর লাসিথ মালিঙ্গার জোড়া উইকেট শিকারে শ্বাসরুদ্ধকর এক জয় পায় মুম্বাই ইন্ডিয়ানস।

. সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ বনাম পুনে ওয়ারিয়র্স (২০১৩)

আইপিএলের ইতিহাসে লো-স্কোরিং ম্যাচগুলোর সাতকাহন
Source: Urban Asian

অমিত মিশ্র’র অলরাউন্ড পারফরমেন্সে এবার মাত্র ১১৯ রান টপকাতে ব্যর্থ হয় পুনে ওয়ারিয়র্স। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ভুবেনেশ্বর কুমারের দুর্ধর্ষ বোলিং-এ (৪ ওভারে ২৮ রানে ৩ উইকেট) মাত্র ১১৯ রানেই গুটিয়ে যায় হায়দ্রাবাদ। একপর্যায়ে মাত্র ৪৪ রানেই ৬ উইকেট হারিয়ে বসা হায়দ্রাবাদ অষ্টম উইকেটে অমিত মিশ্র(৩০ রান) আর বিপ্লব সামান্ত্রের(৩৭ রান) ৪০ রানের জুটিতে ১১৯ রানের পুঁজি পায়।

ব্যাটে নেমে আবারও ১৭তম ওভারের ফাড়ায় পরে পুনে। ১০১/৪ থেকে মাত্র ১২ বলের ব্যবধানে বাকি ৬ উইকেট হারায় তারা। ম্যাচ সেরা অমিত মিশ্র তুলে নেন মাত্র ১৯ রানেই ৪টি মূল্যবান উইকেট। ২০ রানে ৩ উইকেট নিয়ে তাকে যোগ্য সহায়তা করেন থিসেরা পেরেরা।

. কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব বনাম মুম্বাই ইন্ডিয়ানস (২০০৯)

আইপিএলের ইতিহাসে লো-স্কোরিং ম্যাচগুলোর সাতকাহন
Source: ESPNcricinfo

তিন নাম্বারে দু’টো ম্যাচ দেওয়ার কারণ- এটাতেও জয়ী দলটি ডিফেন্ড করেছিল ঠিক ১১৯ রান। দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত আইপিএলের একমাত্র আসরে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার ম্যাচটিতে তীরে এসে তরী ডোবে সেসময়ের শচীন-জয়সুরিয়ার মুম্বাইয়ের। সাঙ্গাকারার ৪৪ বলে ৪৫ রানের ইনিংসে পুরো ২০ ওভার শেষে ৮ উইকেটে ১১৯ রান জড়ো করে পাঞ্জাব।

কিন্তু এই রানই অনেক বড় হয়ে দাঁড়ায় মুম্বাইয়ের সামনে যখন পাঁচ ওভার শেষে শচীন-জয়সুরিয়ার উইকেটসহ মাত্র ১২ রানে প্রথম ৩ উইকেট হারায় মুম্বাই। একপ্রান্তে জেপি ডুমিনি উইকেট আগলে রাখলেও ইউসুফ আবদুল্লাহ (১৯ রানে ২ উইকেট) আর ইউসুফ পাঠানের (২০ রানে ২ উইকেট) নিয়ন্ত্রিত বোলিং-এ শেষ ওভারের নাটকীয়তায় ৩ রানে হেরে বসে মুম্বাই ইন্ডিয়ানস। কুমারা সাঙ্গাকারা ম্যাচ সেরা নির্বাচিত হন।

. সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ বনাম মুম্বাই ইন্ডিয়ানস (২০১৮)

আইপিএলের ইতিহাসে লো-স্কোরিং ম্যাচগুলোর সাতকাহন
Source: Hindustan Times

চলতি আইপিএলে বাংলাদেশীদের দৃষ্টি সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ আর মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের দিকে। কারণ এ দু’টো দলেই খেলছেন বাংলাদেশের দুই তারকা প্রতিনিধি সাকিব আল হাসান আর মুস্তাফিজুর রহমান। গত সপ্তাহে হয়ে যাওয়া ম্যাচটিতে সাকিব-মুস্তাফিজ দু’জনেই নিজেদের সর্বোচ্চটা দিলেও মুস্তাফিজের মুম্বাই লো-স্কোরিং ম্যাচে ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায় শোচনীয় ভাবে হেরে বসে সাকিবের হায়দ্রাবাদের কাছে।

প্রথমে ব্যাট করতে নেমে সবার ছোট ছোট অবদানে মাত্র ১১৮ রানে শেষ হয় হায়দ্রাবাদের ইনিংস। মুস্তাফিজ মাত্র ১৮ রানে পান ১টি উইকেট। জবাবে হায়দ্রাবাদের দুর্দান্ত বোলিং লাইনআপের সামনে অসহায় আত্মসমর্পন করে মুম্বাই। ব্যাটিঙে সুবিধা করতে না পারলেও গুরুত্বপূর্ণ ২ টি উইকেট তুলে নেন সাকিব। ১১৮ রানের টার্গেটে মাত্র ৮৭ রানেই গুটিয়ে যায় মুম্বাই। ম্যান অব দ্যা ম্যাচের পুরষ্কার জিতে নেন ৩ উইকেট নেওয়া হায়দ্রাবাদের সিদ্ধার্থ কাউল।

. চেন্নাই সুপার কিংস বনাম কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব (২০০৯)

আইপিএলের ইতিহাসে লো-স্কোরিং ম্যাচগুলোর সাতকাহন
Source: YouTube

মাত্র ১১৬ করেই দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে পাঞ্জাবকে ২৪ রানে হারায় ধোনির চেন্নাই সুপার কিংস। ওপেনার পার্থিব প্যাটেলের ৩২ রানই ছিল পাঞ্জাবের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর। জবাবে শুরু থেকে মুরালিধরন-আশ্বিন-রায়নার স্পিন ট্রয়োতে খোলসে আটকে থাকে পাঞ্জাব। তিনজনই দুটো করে উইকেট শিকার করেন। পুরো বিশ ওভার শেষে পাঞ্জাবের স্কোর দাঁড়ায় ৮ উইকেটে ৯২ রান। চার ওভারে মাত্র ৮ রান দিয়ে ২ উইকেট নেওয়া স্পিন লিজেন্ড মুত্তিয়া মুরালিধরণ হন ম্যান অব দ্যা ম্যাচ।

লো-স্কোরিং এই ম্যাচগুলোই প্রমাণ করে ক্রিকেট গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা। একারণে প্রথম ইনিংসে দলের নগণ্য স্কোরেও সমর্থকরা আশায় বসে থাকে সেই স্কোর ডিফেন্ড করার। আর এখানেই ক্রিকেটের সৌন্দর্য, যার ফলে দিনে দিনে এর জনপ্রিয়তাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

, , , , , , , , ,