আইপিএলঃ ক্রিকেট না বাণিজ্য? নাকি উভয়ই?

শুরু হয়ে গেছে ক্রিকেট জগতের সবচেয়ে রঙিন উৎসব। বুঝতেই পারছেন কিসের কথা বলছি। হ্যা, বলছি আইপিএল এর কথা। যার পূর্ণাঙ্গ রুপ হল ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ, যদিও খোদ ভারতীয় মিডিয়াই ব্যঙ্গ করে বলেন থাকে “ইন্ডিয়ান প্যায়সা লিগ”।

অথচ ক্রিকেট বিশ্বকাপের হওয়া উচিৎ ছিল পৃথিবীর ক্রিকেটের সবচেয়ে রঙিন উৎসব। কিন্তু টাকার কাছে সারা দুনিয়াই যখন মাথা নোয়ায় তখন ক্রিকেট এমন কিবা জিনিস। বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে ধনী বোর্ড দেখিয়ে দিয়েছে কিভাবে ক্রিকেটকে পুরোপুরিভাবে একটি পন্যে রুপান্তর করা যায়। আর বাকি বোর্ড গুলোও এই আইডিয়ার ফায়দা তুলতে চেষ্টা করছে।

শুরুর কথা:

ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নামে বা ব্রান্ডের নামে দলের অংশগ্রহনে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট সব দেশেই অল্পবিস্তর হত। কিন্তু তা হতে এত বিশাল আকারের ব্যবসাসফল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজন করা যায় এটা  প্রথম মাথায় আসে ভারতের অন্যতম বড় মিডিয়া কোম্পানি জি এন্টারটেইনমেন্ট এর মাথায়।  তারা ২০০৫ সাল থেকেই “ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগ” নামে সারা দেশে ব্যাপী টি২০ ফরম্যাটের ফ্রাঞ্চাইজি ভিত্তিক  ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজন করার কথা পরিকল্পনা করতে থাকে। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বরাবরই তাদের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বাধা দেয়।

এক পর্যায়ে ২০০৭ সালে নিজেদের অর্থায়নে ব্যক্তিগত একাধিক ভেন্যু তৈরি করে তারা  মাঠে নামায় ভারতীয় বোর্ডের অনুমোদনহীন এক লীগ। শুধু ঘরোয়া না তারা দেশ বিদেশের বেশ কিছু হাই প্রোফাইল ক্রিকেটারের নামও যুক্ত করে ফেলে তাদের লিগে। আইসিএল এর এই অগ্রযাত্রা চিন্তার ভাজ ফেলে ভারতীয় বোর্ডের কপালে।

Source: thehotshott.com

শেষতক ২০০৯ সালে  বিসিসিআইর অনুরোধে আইসিসিও  চুড়ান্ত ভাবে আইসিএলকে অবৈধ ঘোষনা করে এবং এর যাবতীয় কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।  সাথে এতে অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়দেরও যার যার দেশের বোর্ড নিষিদ্ধ ঘোষনা করে। ততকালীন বাংলাদেশ ক্রিকেটের কিছু ভাল ও সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়ও সাময়িক বলির পাঠা হয়।

আইসিএল নিষিদ্ধ হলেও ভারতীয় বোর্ড কিন্তু ঠিকই ততদিনে এই ব্যাপক সম্ভাবনাময় ক্রিকেট বানিজ্যের আইডিয়া মাঠে বাস্তবায়ন করে ফেলে। ২০০৮ সালে দেশ-বিদেশের ক্রিকেটে সবচেয়ে বড় বড় নাম গুলোকে বিশাল টাকার অংকে এক এক দলে ভিড়িয়ে শুরু করে “ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ” ওরফে আইপিএল।

ভিনদেশে “ঘরোয়া” লিগ:

২০০৯ সালে আইপিএল সবে মাত্র পা দেয় তার দ্বিতীয় আসরে। আর সে বছরই ছিল ভারতের জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচন আর আইপিএল এর শিডিউল প্রায় একই সময়ের মধ্যেই পরে যায়। আর তাই ভারত সরকার এত বড় নির্বাচন যজ্ঞের মধ্যে আইপিএল কে যথাযথ নিরাপত্তা দিতে অপারগতা জানায়। কিন্তু তাই বলে কি আর থেমে থাকবে ব্যবসা সফল আইপিএল! ভারতীয় বোর্ড পুরো টুর্নামেন্টটিই উড়িয়ে নিয়ে যায় দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে। এই প্রথম ক্রিকেট বিশ্ব দেখে ভিনদেশের মাটিতে কোন দেশের আস্ত একটা “ঘরোয়া” টুর্নামেন্ট!

স্পট ফিক্সিং ও  ম্যাচ ফিক্সিং বিতর্ক:

২০১৩ সালে প্রথমবারের আইপিএলের কালো দিকটা সবার সামনে আসে। আইপিএলের মাঠে আর মাঠের বাইরে বুকি বা বাজিকরদের আনাগোনার খবর  সবার নজরে আসে। আইপিএলের ভারতীয় ক্রিকেটার শ্রীশান্ত, অজিত চান্ডিলা আর অংকিত চাভান নাকি মাঠে স্পট ফিক্সিং করেছেন। এর যথাযথ প্রমান সহ ভারতীয় বোর্ড তাদের আজীবন নিষিদ্ধ করে সর্ব প্রকার ক্রিকেট থেকে।

এত বড় আয়জনে মাত্র তিনজন ক্রিকেটার মিলে এমন এক কলঙ্কের দাগ একে দিল, এটা সত্যই বিস্ময়কর! নাকি তারা তিন জন ছিল বৃহৎ এর সার্থে ক্ষুদ্রের বলিদান।

আইপিএল
Source: newslivetv.com

আবার ২০১৫ সালে আইপিএল কলঙ্কিত হয় মাঠের বাহিরের কিছু মানুষের জন্যে। ভারতীয় বোর্ডের বিশেষভাবে গঠিত লোধা কমিটি আইপিএলের দুই জনপ্রিয় ফ্রাঞ্চাইজি চেন্নাই সুপার কিংস আর রাজস্থান রয়েলসের মালিক পক্ষকে ২ বছরের জন্যে আইপিএল থেকে বহিষ্কৃত করে, সাথে কয়েকজনকে ক্রিকেট থেকে আজীবন নিষিদ্ধ। তারা নাকি মাঠের বাইরে ম্যাচ গড়াপেটার মত ক্রিকেটের জন্যে ক্ষতিকারক ও অনৈতিক কাজে জড়িত ছিলেন।

এখন প্রশ্ন মালিক পক্ষ যদি কোন কিছুর পরিকল্পনা করেও থাকেন তা তো মাঠের খেলোয়াড়রাই বাস্তবায়ন করে থাকেন। সেক্ষেত্রে খেলোয়াড়েরাও কি শাস্তির আওতায় আসে না? নাকি জাতীয় ক্রিকেটের বড় বড় নাম জড়িত থাকায় বোর্ড এই বিষয়ে সুকৌশলে দৃষ্টি এড়িয়ে যায়?

আইপিএলের আদলে সারা দুনিয়াতেই আজ ফ্রাঞ্চাইজি টি২০ ক্রিকেটের জয়জয়কার। আমাদের দেশীয় বিপিএলও এই আইপিএলের অনুপ্রেরণাতেই তৈরি। আর অনুমিত ভাবে এটিও কখনোই বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না।  তাছাড়া মাঠে  তো ব্যাট বল দিয়ে ক্রিকেটাই খেলা হয়। আর তাই দেশের দুই প্রতিনিধিত্বকারী ক্রিকেটারের পারফর্মেন্স দেখার জন্যেই হোক বা কিছুটা বিনোদনের জন্যে  আইপিএল খারাপ না, কি বলেন?

, , , , , , , , ,